ড. সামছুল হক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবহন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি করেছেন। বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতনামা তিনি। সম্প্রতি “সাপ্তাহিক” ম্যাগাজিনকে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে পরিবহন খাত নিয়ে বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেছেন এই প্রকৌশলী। তার মধ্য থেকে এখানে চুম্বক অংশ তুলে দিলাম।

 

সরকারও তো হোয়াইট কালার জবে বিশ্বাসী। ফ্লাইওভার উদ্বোধন করতে ফিতা কাটা যায়। ফুটপাত দখলমুক্ত করে বা গণপরিবহনের সেবা বাড়িয়ে ফিতা কাটা যায় না। এখানে ঘাম ঝরে। সবই সিন্ডিকেটের অংশ। আগে ডিপার্টমেন্টগুলো মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি করত। এখন আর তা নেই। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গিয়ে দেখুন, কি সর্বনাশ করা হয়েছে। কোনোই জবাবদিহিতা নেই।

যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে অযৌক্তিক ফ্লাইওভারের কারণে, তা আর কোনো দিনই পূরণ হবার নয়। অযৌক্তিক উন্নয়নের ভাগিদার অনেক। ডিসিসি না করলে বিবিএ করছে। নতুবা সেনাবাহিনী করছে। সেনাবাহিনী না করলে এলজিআরডি বা সড়ক বিভাগ করে ফেলছে। সবাই তো ব্যবসা, কমিশন নিয়েই ব্যস্ত।

 আজ থেকে ২০ বছর আগে রাজধানীতে ঘণ্টায় গতি ছিল ২৫ কিলোমিটার। ৫ বছর পর হল ঘণ্টায় ১৮ কিলোমিটার। ১৯৯৪ সালে ডিআইটিএস প্রথম এই গতি নিয়ে রিপোর্ট করে। ১৯৯৮ সালে রিপোর্ট করে ডিইউটিপি। এখন রিভাইসড এসটিপি রিপোর্ট বলছে, রাজধানীতে ঘণ্টায় গড় গতি হচ্ছে ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। তার মানে নগরবাসীর গতি এক প্রকার স্থবির প্রায়।… এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে দশ বছর পর এই শহর পুরোই স্থবির হয়ে পড়বে।


 সোজা, সস্তা এবং ভোটের রাজনীতির জন্যই এখন উন্নয়ন হয়। এই উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। গণপরিবহনকে নির্দেশিত (ডিকটেটেড) করে, চাপিয়ে দেয়া আদেশ দিয়ে একটি শহরের উন্নয়ন হতে পারে না।… আমি এই উন্নয়নকে ডিক্টেটেড উন্নয়ন বলি। যার অর্থ নির্দেশিত বা স্বেচ্ছাচারী উন্নয়ন।


 মগবাজার এবং মৌচাকের দুটি জায়গায় ফ্লাইওভারের উপরে সিগন্যাল বসাতে হবে। এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, রাস্তা ধ্বংস করে, ফুটপাত নষ্ট করে তাহলে কী লাভ হলো? যে দুটি সিগন্যালের কারণে মৌচাক-মগবাজারে যানজট হতো, সেই দুটি সিগন্যাল রয়েই গেল।… পুলিশ ফ্লাইওভারে বসে সিগন্যাল দেবে। বিশ্ববাসীর কাছে হাসির কারণ হবে।


এসব না করে যদি ফুটপাতটি দখলমুক্ত করে, আরো প্রসারিত করে দিত, মানুষ দুই-তিন কিলোমিটার হেঁটেই যেত। মানুষ হাঁটার জায়গা পায়না বলেই গাড়িতে বসে থাকতে বাধ্য হন। অথচ এর জন্য অর্থ ব্যয় করতে হতো না। ফ্লাইওভারের কারণে ফুটপাত সংকীর্ণ হয়ে গেল। মূল সড়কে খুঁটি বসল। চাইলেও আর মেট্রো বা বিআরটি করা সম্ভব হবে না।


 অপেশাদার জনবলই আত্মঘাতী উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। খাম্বা বা দৃশ্যমান খুঁটিই এদের কাছে উন্নয়নের দর্শন।


দুটি সিগন্যাল আছে, এটি বুঝতেই সময় লাগল তিন বছর। তাহলে ফাঁদ থেকে বের হবেন কি করে! মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে যান। কোনো ড্রেনেজ সিস্টেম পাবেন না। যারা এটি তৈরি করেছেন, তারা জানেন এটি উজবুকের জাতি। যা দিবেন তাই খাবে। কোনো হৈচৈ হবে না। ফ্লাইওভারের বৃষ্টির পানি সরাসরি পড়ে নিচের রাস্তা নষ্ট করছে। নিচের রাস্তা ভালো থাকলে তো কেউ আর ফ্লাইওভারে উঠতে চাইবে না।


দাতারাও বুঝে গেছে, এ দেশে যা দেবে তাই খাবে। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার কানাডার লিয়া নামের একটি কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান পেয়েছিল। কলসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি। তারা পাঠিয়ে দিল কলকাতার অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে, যারা আমার সামনে বসলে হাঁটু কাঁপত। কাজের প্রেজেন্টেশন দিত সাদারা আর কাজ করত কলকাতার লোকজন। ভুল করলেও এখানে কেউ ধরতে পারে না, তাহলে ভালো প্রতিষ্ঠান বা পেশাদার জনবল পাঠানোর দরকার কি?


 ঢাকার চাইতে চট্টগ্রামের অবস্থা আরও করুণ। চট্টগ্রামে আপনি ফ্লাইওভার ছাড়া কিছুই দেখতে পাবেন না। গণপরিবহনের নাম গন্ধ নেই সেখানে। মাথায় পচন ধরলে তো অন্য অঙ্গও অকেজো হয়ে যায়। ঢাকায় তাও দুই একটি গণপরিবহন মিলছে। অন্য শহরে তাও নেই। ইজিবাইকের ছড়াছড়ি। সিএনজির দখলে রাস্তা। রাস্তাও আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। রাস্তার পাশে বড় বড় ভবন হচ্ছে। এমন একটি ভঙ্গুর মেরুদণ্ডের ওপর শহর কতদিন বাঁচবে তা সহজেই অনুমেয়।


পুরো দেশটা যদি একটি শরীরের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে প্রত্যেকটা শহর হচ্ছে একেকটি ক্যান্সার সেল। ক্যান্সারের সেল অনিয়ন্ত্রিত বেড়েই শরীরে মৃত্যু ঘটায়। শহরগুলোর উন্নয়নও অনিয়ন্ত্রিতভাবে হচ্ছে। ফ্রি স্টাইলে যা ইচ্ছা তাই হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রামগুলোও কথিত শহরের রূপ নেবে। তখন ক্যান্সার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আর কোনো সরকারই ম্যানেজ করতে পারবে না।


তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও নানা সমালোচনা আছে। আমরা কেউই এমন সরকার চাই না। এরপরেও কথা থেকে যায়। তারা মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকল। হাতিরঝিল তারাই পেরেছে। কুড়িল, বনানী তারাই করেছে। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বিমানবন্দরের মধ্য দিয়ে একটি সড়ক করা। সেটিও সম্ভব হয়েছে তাদের আমলে। অথচ শক্তিশালী গণতন্ত্রের কথা বলেও মেট্রোরেল সেদিকে নিতে পারেনি। জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে এত বছর পরেও কেন একটি প্রাইমারি সড়ক করতে পারল না?


 যোগাযোগ ভালো থাকলে অর্থাৎ মানুষ যদি রেলের উপর ভরসা পেত তাহলে ঢাকা ছেড়ে দিত। বাড়ি থেকে এসে অফিস করত। বাইরের দেশে তাই হয়। ১৫ মিনিটে আসতে পারলে নারায়ণগঞ্জের লোক ঢাকায় বসবাস করবে কেন?


 ঢাকা বাংলাদেশের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান। অনেক দেশেই এমন শহর থাকে না। অথচ সরকার তার সুবিধার জন্য যেটুকু দরকার সেটুকুই করছে। ফলে উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে, তা হলো ঢাকাকে স্তিমিত করে দেয়া।


একটি শহরের দুটি স্পন্দন (বিট) সময় থাকে। সকাল এবং বিকেলে। ঢাকায় সকালে বিট উঠলে আর নামে না। রাতেও তাই থাকে। ঢাকা এখন স্পন্দনহীন মৃত নগরী। পছন্দমাফিক উন্নয়নে নিজের স্বার্থ হাসিল হয়, জনগণের স্বার্থ এখানে মার খায়। সম্ভাবনা ছিল, সরকার নষ্ট করছে। ব্যক্তি উদ্যোগে দেশ এগিয়ে গেলেও রাজনীতি, সরকার সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


আমাদের (ঢাকায়) খাল ছিল, চারটি নদী ছিল। সেগুলো গলা টিপে হত্যা করা হলো। মশা হয় বলে খাল বন্ধ করারও নজির আছে। একটি খালকে একেবারে বন্ধ করে দেয়া হলো, এত বড় অপরাধের জন্য কোনোই জবাবদিহিতা নেই। নেই কোনো অনুশোচনাও।


 আমি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছি না। শুধু বলব, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয়। আরও দেশ আছে, সেখানে নগর আছে, উন্নয়ন হচ্ছে। তার তুলনায় আমরা কি করছি, সেটাই ভাবনার বিষয়। লোকদেখানো উন্নয়ন ঘটিয়ে অপার সম্ভাবনা নষ্ট করার কোনো অধিকার সরকারের নেই। একইভাবে ডিকটেটেড উন্নয়নও করতে পারে না সরকার। করতেই হবে এমন মনোভাব জনস্বার্থে যায় না। বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ঘটলেই জনস্বার্থ রক্ষা হয়।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here